Menu

পদ্মা-মহানন্দা-পুনর্ভবা ও পাগলা নদী যেন আজ মরা খাল


ডি এম কপোত নবী,চাঁপাইনবাবগঞ্জঃ

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ও কালের স্বাক্ষী হয়ে অনেক ইতিহাস এ জেলার রয়েছে। প্রাচীন গৌড় নগরী নওয়াবগঞ্জ হচ্ছে আজকের চাঁপাইনবাবগঞ্জ। পরিবর্তনের প্রভাবে এখানেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আর এর পাশ দিয়েই বয়ে চলে গেছে মহানন্দা নদী। পরিবর্তনের সাথে সাথে মহানন্দা নদীও যেন বদলে গেছে। বর্তমানে এটাকে নদী না বলে মরা খাল বললেও ভূল হবে না। পাঁয়ে হেটে নদীর এপার থেকে ওপারে যাওয়া যাবে এখন। প্রথম যে কেউ দেখলে এটাকে নদী বলবে না। পানি না থাকায় নদী যেন খালে পরিনত হয়ে গেছে। নদীর বুকের দু’ধারের বিশাল অংশে এখন চলছে তাই ধান চাষ।
২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে বীর শেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মহানন্দা সেতু পার হয়ে বারঘরিয়া অংশে দেখা যায় নদীতে পানি শূণ্য। নদীর বুকে রোপন করা হয়েছে চৈতালী ধান। সেতুর পিলারের শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে পানি না থাকার কারণে। পানিশূন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের নদ-নদী মরণ বাঁধ ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগোচ্ছে সীমান্তবর্তী এ জেলা। বাঁধের কারণে একদিকে প্রমত্তা পদ্মা যেমন নাব্য হারিয়েছে, তেমনি দেড় যুগ ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা-তীরবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক নদীভাঙন হয়েছে। জেলাতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নদী। এখানে প্রধান নদী পদ্মা, মহানন্দা, পুনর্ভবা ও পাগলা।
গঙ্গা নদী ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে পদ্মা নাম ধারণ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উজানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মিত হওয়ার পর থেকে পদ্মায় পানি প্রবাহ কমতে থাকে এবং বিশাল চর জেগে উঠতে থাকে। বর্তমানে পদ্মা তার পূর্বেকার রূপটি হারিয়ে ফেললেও প্রতিবছর বর্ষাকালে সে প্রলয়ঙ্কারী রূপ ধারণ করে। পদ্মা বাংলাদেশের একটি প্রধান নদী। এটি হিমালয়ে উৎপন্ন গঙ্গানদীর প্রধান শাখা এবং বাংলাদেশের ২য় দীর্ঘতম নদী। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর রাজশাহী এই পদ্মার উত্তর তীরে অবস্থিত। পদ্মার সর্বোচ্চ গভীরতা ১,৫৭১ ফুট (৪৭৯ মিটার) এবং গড় গভীরতা ৯৬৮ফুট (২৯৫ মিটার)। রাজা রাজবল্লভের কীর্তি পদ্মার ভাঙ্গনের মুখে পড়ে ধ্বংস হয়ে বলে পদ্মার আরেক নাম কীর্তিনাশা।
পদ্মার প্রধান উপনদী মহানন্দা ও পুনর্ভবা। মহানন্দা উপনদীটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এবং পুনর্ভবা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার বিভিন্ন শাখানদীর মধ্যে গড়াই, আড়িয়াল খাঁ, কুমার, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব ইত্যাদি অন্যতম। আবার পদ্মার বিভিন্ন প্রশাখা নদীসমূহ হলো- মধুমতী, পশুর, কপোতাক্ষ ইত্যাদি। এই নদীগুলো কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালি ইত্যাদি জেলার উপর দিয়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মহানন্দা নদী রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরটি মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত। মহানন্দা নদী ভারত ও বাংলাদেশের একটি নদী। এর উৎপত্তিস্থল হিমালয় পর্বতের ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার অংশে। এখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশ দিয়ে প্রবাহিত হযয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর পর আবার পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় প্রবেশ করে। পরে আবার বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের কাছে প্রবেশ করে পদ্মা নদীর সাথে মিলিত হয়। বৃষ্টির পানি এই নদীর প্রবাহের প্রধান উৎস। ফলে গরম কাল ও শীতকালে নদীর পানি কমে যায়। আর বর্ষা মৌসুমে নদীর দুই কুল ছাপিয়ে বন্যা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মহানন্দা নদীর অংশটির দৈর্ঘ্য ৩৬ কি.মি। অপরদিকে ভারত থেকে আসা পাগলা নদী শিবগঞ্জ উপজেলার তর্ত্তীপুরে মরাগঙ্গার সাথে মিলিত হয়ে কিছুদূর এগিয়ে মহানন্দায় পড়েছে। দিনাজপুর থেকে নওগাঁ জেলা হয়ে পুনর্ভবা নদী চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
ফারাক্কার একতরফা পানি প্রত্যাহার ও শুষ্ক মৌসুমের শুরুর সঙ্গে সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পূনর্ভবা নদী পানিশূন্য এবং বিশাল চর জেগে ওঠায় সেচ সুবিধা এখন হুমকির মুখে। এক সময়ের খর¯্রােতা পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পূনর্ভবা নদী গত দু’দশক ধরে ভরাট হয়ে এখন পুরোপুরি নাব্যতা হারিয়েছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে পদ্মার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ। ভারত গঙ্গার পানি চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে পানি না দেয়ায় এখন নদীগুলোর দু’ধারে বিশাল বিশাল চর জেগে উঠেছে। ভারত ফারাক্কায় শুধু বাঁধ দেয়নি, পাশাপাশি নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে মরা ভাগিরথী নদীকে খনন ও শাসন করে তারা নদীর দু’ধারে সেচ সুবিধা দিয়ে খাদ্য উৎপাদনে সফলও হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে পদ্মার দু’ধারে জেগে উঠেছে বালুচর। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ গত ৩ দশক ধরে ফারাক্কায় তাদের ইচ্ছেমতো পানি ধারণ এবং বন্যার সময় ব্যারেজের গেট খুলে দেয়ায় বাংলাদেশে হঠাৎ বন্যা ও তীব্র নদী ভাঙনে বসতভিটা এবং জমি হারিয়ে অনেকেই সর্বশান্ত হয়েছে ও হচ্ছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে পদ্মা নদী সীমান্ত ছেড়ে ১৬ কি. মি. ভেতরে প্রবেশ করেছে, অন্যদিকে মাইলের পর মাইল বালুচর জেগে উঠেছে। পদ্মা ও মহানন্দায় অসংখ্য চর জেগে ওঠায় নৌচলাচল একেবারে বন্ধের উপক্রম। অন্যদিকে, মহানন্দা নদীর পানি উত্তোলন করে প্রায় ১৫টি বৃহৎ সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির সেচ হুমকির মুখে পড়ায় ফসলের ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চিত দেখা দিয়েছে। ফারাক্কার অশুভ প্রতিক্রিয়া, জলবায়ুর পরিবর্তন ও বার্ষিক বৃষ্টির হার কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে জেলার ৪টি নদীতে পানি না থাকায় সবচেয়ে বিরূপ প্রভাব পড়েছে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরে।
জেলার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে প্রায় ৮০-৮৫ ফুট নীচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলে গোমস্তাপুর, নাচোল ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের কিছু অংশে পানির স্তর নেমে যাওয়া উদ্বেগজনক। নদীর পানি অস্বাভাবিক হ্রাস পাওয়ায় দেশি প্রজাতির মিঠা পানির মাছ এক প্রকার হারিয়ে গেছে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পানিচুক্তির সঠিক বাস্তবায়নে সরকারকে অনুরোধও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। নদীতে পানি না থাকার কারণে সব দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। রাবার ড্যাম নির্মানের তাই বিকল্প কিছু নেই।

Flag Counter

December 2019
M T W T F S S
« Nov    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031