Menu

শিবগঞ্জে বিএনপি-জামায়াত ঘাটিতে দুইভাগে বিভক্ত আ.লীগ

বিজয় নিউজ বিডি, ১৯ ডিসেম্বর, জেলা প্রতিনিধি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ :
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌরসভার গত পাঁচ বারের নির্বাচনে কোনোবারই জিততে পারেনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। চারবার বিএনপির প্রার্থী ও একবার জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। শিবগঞ্জে আওয়ামী লীগের এই ‘ভংগুর’ অবস্থানে এবার নির্বাচনে গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কারিবুল হক রাজিন।
জেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে শিবগঞ্জ আসনের এমপির বিরোধের জের ধরেই এখানে একক প্রার্থী দিতে আ’লীগ ব্যর্থ হয়েছে বলেও দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন। ফলে আগামী ৩০ ডিসেম্বর পৌরসভা নির্বাচনে এখানে এবার শক্ত অবস্থানে রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী।po
এতে করে আ’লীগের বিরোধ মিটিয়ে দলে ঐক না আনতে পারলে এখানে এবারো শিবগঞ্জ পৌরসভার হাল ধরতে যাচ্ছে মৌলবাদি দল জামায়াত। যাদের কারণেই আমের জন্য বিখ্যাত এই শিবগঞ্জ হয়ে উঠে রক্তাক্ত প্রান্তর।
সূত্র মতে, সর্বশেষ শিবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি সমর্থন নিয়ে জিতেছেন শামীম কবির হেলিম। বর্তমানে মামলার কারণে দায়িত্ব থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সেখানে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন ৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ঈমানী আলী।
১৯৯১ সালে শিবগঞ্জ পৌরসভা গঠনের পর প্রথম নির্বাচনে নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা মোতাহেরুল ইসলাম ঘেটু। পরে চেয়্যারম্যান পদটি দখলে নেয় জামায়াত নেতা জাফর আলী। এরপর নির্বাচনে জিতেছেন আলহাজ্ব শামীম কবির হেলিম। তিনি চলতি মেয়াদসহ দুইবার নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপট:
শিবগঞ্জ পৌরসভায় শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ ভালো অবস্থান দাঁড় করাতে পারেনি। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে ২০০৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়েছে দলটি। শিবগঞ্জ পৌরসভায় ভোটের অঙ্কে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ থেকে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী আবির্ভূত হয়েছেন।
এখানে দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও ঠিকাদার ময়েন খাঁন। বিদ্রোহী হিসাবে মাঠে আছেন শিবগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কারিবুল হক রাজিন।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, শিবগঞ্জ আসনের এমপি গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক মইনুদ্দিন মন্ডল ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওদুদ এমপির অভ্যন্তরীণ দ্বদ্ব চলে আসছিল বেশিকিছুদিন ধরে। কারিবুল হক রাজিন গোলাম রাব্বানী এমপির আস্থাভাজন হওয়ায় দ্বদ্বের বহি:প্রকাশ হিসাবে রাজনকে বাদ দিয়ে হঠাৎ করেই আবির্ভূত হন জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ময়েন খাঁন।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও শিবগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিকুল ইসলাম টুটুল খানের সমর্থন নিয়ে ময়েন খানকে কেন্দ্রে একক প্রার্থী হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। জেলার সুপারিশের প্রেক্ষিতে কেন্দ্র ময়েন খানের হাতেই তুলে দেন নৌকা প্রতীক।
যদিও জেলা আওয়ামী লীগের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছেন শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রাব্বানী এমপি ও সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট আতাউর রহমান।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের হাওয়া শুরুর সময় মেয়র পদে প্রার্থী হতে তৎপরতা শুরু করেন গত নির্বাচনে দলীয় সমর্থন নিয়ে মেয়র প্রার্থী কারিবুল হক রাজিন ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিকুল ইসলাম টুটুল খান, ভারপ্রাপ্ত মেয়র ইমানী আলী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া।
গত ৮ নভেম্বর গোলাম রাব্বানী এমপির পুকুরিয়াস্থ বাড়ির সামনে শেখ রাসেল মিলনায়তনে ‘তৃণমূলের’ এক সভায় কারিবুল হক রাজিনকে উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মেয়র পদে সমর্থন জানানো হয়। ওই সভা চলমান অবস্থায় সভা আহ্বানকারী টুটুল খান সভা বর্জন করে অনুসারীদের নিয়ে চলে আসেন। তার চলে আসার পরই গোলাম রাব্বানী এমপি রাজিনকে প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করেন।
টুটুল অভিযোগ করে জানান, গোলাম রাব্বানী এমপি ও রাজিন পরিকল্পিতভাবে ‘ভাড়াটে’ লোকজন নিয়ে ওই সভায় আসার কারণে সভা মূলতবি ঘোষণা করে সভা ত্যাগ করেন তিনি।
‘ঘনিষ্ঠজন’ হিসাবে পরিচিত রাজিনকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেন গোলাম রাব্বানী এমপি। গোলাম রাব্বানী এমপির বিরুদ্ধে একযোগে সংবাদ সম্মেলন করে টুটুল খান, ইমানী আলী ও গোলাম কিরবিয়া। সংবাদ সম্মেলন তারা রাজিনকে দলীয় প্রার্থী হিসাবে প্রত্যাখান করেন।
এরই মধ্যে রাজিন পৌরসভার আনাচে কানাচে তার প্রচারণা চালিয়ে যান।
শিবগঞ্জের আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোনয়ন বন্টনের আগেই মাঠ গুছিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্থান তৈরী করেছিলেন রাজিন। এরই মাঝে ময়েন খানের প্রার্থী হিসাবে চলে আসলে বিপাকে পড়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। একদিকে রাজিনের প্রতি দূর্বলতা। অন্যদিকে নৌকা মার্কা, এ নিয়ে দ্বিধা দ্বদ্বে পড়েছে নৌকার ভোটাররা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতাকর্মী জানান, ‘সদর এমপি ও শিবগঞ্জ আসনের এমপির দ্বদ্বের জের ধরেই এমনটা হয়েছে।
দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলেছেন, ‘জামায়াতের নাশকতার সময় চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করা রাজিনের প্রতি রয়েছে তাদের দূর্বলতা। আবার বিনয়ী ও আর্থিক স্বচ্ছলতার দিক দিয়ে ময়েন খানকেও বাদ দিতে পারছেন না অনেকেই। ফলে সাধারণ কর্মীরা দ্বিধা-দ্বদ্বে রয়েছেন।’
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনীত প্রার্থী ময়েন খান বলেন, আওয়ামী লীগ যাচাই-বাছাই করেই আমাকে প্রার্থী হিসাবে দিয়েছে। আমার পরিবারের সকলেই আওয়ামী লীগ পরিবারের। দলের সকল দুর্দিনে আমরা পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকবো। নির্বাচিত হলে জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে এগিয়ে যাবো বলে আমি মনে করি।’
আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কারিবুল হক রাজিন বলেন, বিদ্রোহী বললে ভুল হবে, জনগণের স্বার্থ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে টিকিয়ে রাখতে নির্বাচন করছি। যারা টাকার বিনিময়ে দল বিক্রি করে প্রতিবাদস্বরুপ নির্বাচনে অংশ নেওয়া। স্থানীয় ও তৃণমূল নেতাকর্মীরা দলের প্রার্থী হিসাবে মত দিলেও রাতের আধারে জেলা আওয়ামী লীগের কাছে গিয়ে পরিবর্তন হয়ে যায়।
দল থেকে মনোনীত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি ঘেঁষার অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচীতেও সে কখনো যায়নি। সেই অখ্যাত ও দলের কর্মীদের কাছে অপরিচিতকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে জনগণই আমাকে নির্বাচনে থাকতে বলেছে। নির্বাচন আমি করবোই।’

বিএনপির অবস্থা:
অতীতের চিত্র থেকেই দেখা যায়, শিবগঞ্জে বিএনপির অবস্থান সুদৃঢ়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা সাবেক হুইপ ও অধ্যাপক শাজাহান মিঞার এমপির বাড়ি শিবগঞ্জে। সেই সুবাদে শিবগঞ্জ সদরে বিএনপি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিএনপি আরেক নেতা আলহাজ্ব শামীম কবির হেলিম। গত পাঁচটি নির্বাচনে চারটিতেই চেয়্যারমান ও মেয়র নির্বাচিত হয় বিএনপির নেতারা। বর্তমান মেয়র আলহাজ্ব শামীম কবির হেলিম ‘হেভি ওয়েট’ প্রার্থী হলেও একাধিক মামলায় ‘জর্জরিত’ হবার কারণে এবার বিএনপি প্রার্থীতায় পরিবর্তন এনেছে।

প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দিয়েছে পৌর বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলামকে। চলতি নির্বাচনে ধানের শীষের প্রতীক পাওয়া শফিকুল ইসলাম হেলিমের চেয়ে ‘চৌকস’ না হলেও শিবগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির ‘ভোট ব্যাংক’ থাকায় বিএনপি প্রতিন্দদ্বীতায় এগিয়ে থাকবে এমনটাই দাবি বিএনপির নেতাদের। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট থাকলেও শিবগঞ্জে বিএনপি ও জামায়াতের আলাদা প্রার্থী রয়েছে।

জামায়াতকে বাইরে রেখেই জিততে চায় দলটি। তবে জামায়াত স্বতন্ত্রভাবে ভোটে অংশগ্রহণ থেকে সরে দাঁড়ালে প্লাস পয়েন্ট হবে বিএনপির। অনায়াসেই নির্বাচনে বেরিয়ে আসবে দলটি।

তবে নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় বিএনপির অভিযোগ, নির্বাচনে কোনো লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। প্রতিপক্ষরা আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয় না। কিন্তু কোনো মামলা না থাকা সত্ত্বেও বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ঠিকভাবে প্রচার-প্রচারণা করতে পারছি না। অযথা হয়রানি বন্ধে গত ৬ ডিসেম্বর সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আবেদন জানানো হলেও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। গ্রেপ্তার হয়রানি চলছেই।

বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসলেও ঠিকভাবে প্রচার-প্রচারণা করতে পারছি না। একদিন করলে অন্যদিন বসে থাকতে হয়। অন্যথায় কোনো মামলা না থাকা সত্ত্বেও কর্মীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পঁচাত্তর বয়সযোদ্ধু এক বৃদ্ধাকেও ধরে নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনই একজন দুই জন করে ধরা হচ্ছে। ফেয়ার নির্বাচন হওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছি।

জামায়াতের অবস্থা:
শিবগঞ্জ পৌরসভায় জামায়াতের অবস্থানও শক্ত দীর্ঘদিন ধরেই। গেল পাঁচটি পৌর নির্বাচনের মধ্যে একটিতে তারা জয়ীও হয়। এবার পৌরসভা নির্বাচনে জামায়াতের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্রের লেবাসে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন আগের নির্বাচিত চেয়্যারম্যান জাফর আলী।

সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকাশ্যে জামায়াতের ভোটের অবস্থান বুঝা যায় না। কিন্তু এখানে তাদের যে বড় অবস্থান রয়েছে, তা বুঝা যায় বিগত সময়ে সাংগাঠনিক কর্মকাণ্ডে। গেল বছরের ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্র“য়ারি জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পরপরই শিবগঞ্জ পুরোটাই ‘নিয়ন্ত্রণে’ নেয় জামায়াত।

সাংগঠনিক অবস্থা জানান দেওয়ার পাশাপাশি ঘটাতে থাকে একেরপর এক সহিংসতা ও নাশকতা। শতাধিক সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। পৌর এলাকার বাইরে কানসাট পল্লী বিদ্যু কেন্দ্র, সোনামসজিদ পর্যটন মোটেলসহ শাহবাজপুর, মোবারকপুর ও শ্যামপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

সরেজমিনে এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পৌরসভা নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় জামায়াতের প্রার্থীকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তবে তাদের বিশাল কর্মী বাহিনী বিশেষ করে নারী কমীরা প্রার্থীর স্বপে গোপনে গোপনে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী ও স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী জাফর আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

Flag Counter

April 2021
M T W T F S S
« Feb    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930