Menu

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এনজিওর ভূমিকা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেভাবে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সহায়তার লক্ষ্যে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওর জন্ম হয়েছে সেভাবে বাংলাদেশেও ১৯৭১ সালের পর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পূনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তার জন্য কিছু সংখ্যক দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে নানা উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করে।

বিশ্বে অবশ্য আনুষ্ঠানিক অবয়বে প্রকাশিত এসব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সারা বিশ্বেই মূলতঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিকশিত হতে শুরু করে।

ভারতবর্ষে একদা মুসলিমদের জন্য ওয়াকফ্ আইন এবং হিন্দুদের জন্য দেবোত্তর আইনে যে প্রাতিষ্ঠানিক স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম শুরু হয়েছিল তারই হাত ধরে আজকের এনজিও কার্যক্রমের বিকাশ।

প্রাথমিকভাবে এনজিওগুলি তাদের কাজ ত্রাণ ও পুণর্বাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীকালে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়:নিস্কাশন, নারীর ক্ষমতায়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকে বিস্তৃতি লাভ করে।

কারণ, তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের পাহাড়সম সমস্যা সরকারের একার পক্ষে সমাধান করা কঠিন। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে সহযোগিতা করলে অল্প সময়ের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সেদিনের সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগই পরবর্তীকালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওর রূপ লাভ করে, যা আজ একটি প্রতিষ্ঠিত তৃতীয় বৃহৎ উন্নয়ন সেক্টর হিসেবে সর্বজন-স্বীকৃত।

বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসমুহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করলেও গুটি কয়েক তথাকথিত এনজিওর নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ফলে ঢালাওভাবে সমগ্র এনজিওকে দোষারোপ করা যায় না।

এনজিওর সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা না থাকায় এনজিও সম্পর্কে অনেকগুলি ভুলবোঝাবুঝির অবকাশ সৃষ্ঠি হচ্ছে। এডাব এর মতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও বলতে তাদেরকেই বোঝায় “যারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমে ধারাবাহিকভাবে সম্পৃক্ত, সংগঠন হিসেবে সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত, নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়, যাদের নিজস্ব অফিস আছে, পূর্ণকালীন কর্মী আছে, সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি আছে, কর্মএলাকা ও উপকারভোগী আছে, ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ও এর প্রয়োগ আছে, কার্যক্রমের বার্ষিক প্রতিবেদন আছে, বার্ষিক বাজেট আছে, নিয়মিত অডিট হয় এবং যাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পেশাদারিত্বের ছাপ আছে, আছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।”

এসব বিবেচনায় বাংলাদেশে সক্রিয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বা এনজিওর সংখ্যা দুই-আড়াই হাজারের বেশি হবে না। নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত হাজার হাজার সংগঠন সারা বাংলাদেশে বিস্তৃত থাকলেও দাতারা সাধারণতঃ এনজিও বলতে সরকারের `এনজিও বিষয়ক ব্যুরো` কর্তৃক নিবন্ধিত সংস্থাসমূহকে বোঝায়।

সাধারণতঃ সমাজসেবা অধিদপ্তর, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, সমবায় অধিদপ্তর, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি, সাব-রেজিস্ট্রার, যুব উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইত্যাদি থেকে নিবন্ধন নিয়ে দেশে অনেকেই কাজ করছেন।

অনেকে আবার নিবন্ধন না নিয়েও কাজ করছেন।

সক্রিয়ভাবে কর্মরত এনজিওগুলোর প্রকৃত সংখ্যা কত তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্ত `এনজিও বিষয়ক ব্যুরো`তে ডিসেম্বর ২০১২ পর্যন্ত নিবন্ধিত এনজিও`র সংখ্যা ২১৯৮টি। এর মধ্যে দেশি এনজিও ১৯৮৩টি এবং বিদেশি এনজিও ২১৫টি। যাদের মধ্যে অনেক এতিমখানা, মাদ্রাসা, হাসপাতালও রয়েছে।

দীর্ঘ চার দশকের এনজিও কার্যক্রম জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামীণ উদ্যোগগুলোকে টেকসই করার জন্য বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।

এরমধ্যে জাতীয় জীবনে নারী-পুরুষের সমঅংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরীতে অবদান রাখা এনজিওদের মূল ফোকাসে চলে আসে।

সাধারণ মানুষ তথা সুবিধাবঞ্চিতদের ক্ষমতা কাঠামোর অংশীদার অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দরিদ্র মানুষের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এসকল বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এপর্যায়ে সামনে চলে আসে অধিকার ভিত্তিক কর্মকৌশল যার উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে একথা জানানো যে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেবা পাওয়া তাদের অধিকার।

এ পর্যায়ে এসে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবী উঠে সকল খাত থেকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসমূহের কাজের বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে সময়ের প্রয়োজনে।

উন্নয়ন চাহিদা অনুযায়ী যুক্ত হতে থাকে নানা কর্মসূচি। তারমধ্যে রয়েছে জামানত বিহীন ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে গ্রামীণ জনসাধারণের বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বিভিন্ন উদ্ভাবনী কর্মসূচি গ্রহণ করা, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাসে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, ডায়রিয়া জনিত শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, সমাজে বিদ্যমান নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করা, দুর্যোগ মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা, ত্রাণ ও পুর্নবাসন কার্যক্রম গ্রহণ করা, খাস জমিতে প্রকৃত ভূমিহীনদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, বস্তিবাসীদের উন্নয়ন ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায় বিচার প্রাপ্তির লক্ষ্যে কাজ করা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী নির্যাতন বন্ধ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, যৌণহয়রানি বন্ধ, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, জলবায়ূ পরিবর্তন জনিত কারণে পরিবেশের বিরুপ প্রভাব মোকাবেলাসহ বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাসমূহের এসব উদ্যোগ জাতীয় উন্নয়নের পাশাপশি আন্তর্জাতিক ভাবেও স্বীকৃতি লাভ করেছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে বেসরকারী উন্নয়ন সেক্টর সম্পর্কে তেমন কোন উদ্যোগ না নিলেও সরকার এনজিও সম্পর্কে একটি সমন্বিত আইন প্রনয়নের উদ্যোগ নিয়োছিল। যদিও পরে সে উদ্যোগের তেমন অগ্রগতি হয়নি। তার পরও অতিসম্প্রতি সরকারের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর উদ্যোগে বিভাগীয় পর্যায়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ভুমিকা ও এনজিও সমাবেশ এর আয়োজন করা হচ্ছে। সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ সরকার ও এনজিওদের মাঝে দুরত্ব হ্রাসে এবং চলমান এনজিও কর্মকান্ডকে গতিশীল করতে ভুমিকা পালন করতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। যার জন্য এ উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন।

দেশের এনজিও কর্মকান্ডের একটি বড় দুর্বল দিক হলো এনজিও সেক্টরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। দেশেব্যাপী এনজিওর কর্মকাণ্ড মূল্যায়ণ, পরিবিক্ষণ ও ক্ষেত্র বিশেষে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে থাকে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো। তবে, এই এনজিও বিষয়ক ব্যুরো শুধুমাত্র বৈদেশিক অনুদান প্রাপ্ত বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাসমুহের কার্যক্রম মূল্যায়ণ, পরীবিক্ষণ ও তদারকি করে থাকে। এর বাইরে স্থানীয় সম্পদ আহরণের মাধ্যমে অনেক এনজিও কাজ করে থাকে।

এসব সংস্থা সাধারণত: তাদের কার্যক্রমের জন্য নিবন্ধন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ, সংস্লিষ্ঠ দাতা সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসনের নিকট দায়বদ্ধ এবং তারা তাদের কার্যক্রম মনিটরিং করে থাকে।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসন মাঠ পর্যায়ে এনজিও কার্যক্রম সমন্বয় ও মনিটরিং করলেও তারা ও কেন্দ্রিয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী রুটিন কাজ করে থাকে।

এ ক্ষেত্রে এনজিওদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হলেও সুফল পাওয়া যেতে পারে। দেশে এনজিও সেক্টরে আর একটি বড় সংকট হলো এনজিও ও অলাভজনক খাতে পৃথক ক্রয় নীতিমালার অনুপস্থিতি।

সরকারি অন্যান্য সকল কেনাকাটার জন্য প্রনীত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট এ্যাক্ট ২০০৮ এর আওতায় এনজিও নিয়োগ করে এনজিও কার্যক্রমকে ঠিকাদারী ব্যবসায় পরিনত করা হয়েছে। ফলে অনেকেই ব্যবসায়ী গাছ, বাঁশ, রিয়েল স্টেট ব্যবসার ফাঁকে নতুন করে এনজিও ব্যবসায় ঝুঁকে পড়েছে। তাই এনজিও সেক্টরে ব্যবসায়িক ধারার উত্থান ও প্রসার বন্ধে এনজিও ও অলাভজনক সেক্টরের জন্য পৃথক প্রকিউরমেন্ট এ্যাক্ট তৈরি করা।

সরকারি প্রকল্পে এনজিও নিয়োগে স্থানীয় উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য স্থানীয় এনজিও নিয়োগের বিধান নিশ্চিত করা, স্থানীয় উদ্যোগকে পৃষ্টপোষকতা প্রদানের জন্য বিধিবিধান তৈরী করা দরকার।

বাংলাদেশে এনজিও সেক্টরে দুটি ধারা চলমান, একটি অধিকার ভিত্তিক উন্নয়ন ধারা, অন্যটি ব্যবসা ভিত্তিক উন্নয়ন ধারা। বিগত সরকারের আমলে তথাকথিত সুবিধাবাদী ধারাটি যারা ব্যবসা ভিত্তিক উন্নয়ন ধারার এনজিওদেরকে রাস্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে বট বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে অধিকার ভিত্তিক ধারার এনজিও সমুহকে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের নিপীড়নের কারণে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে।

সরকারি বেসরকারি সহায়তা লাভের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ঋনদান কার্যক্রমে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ও অধিকার ভিত্তিক ধারার প্রতিষ্ঠানগুলির মাঝে কোনো প্রকার সীমানা নির্ধারণ না থাকায় দেশী-বিদেশী তহবিল পেতে আর্থিক অনিয়ম, অনৈতিক ও বৈষম্যমুলক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হচ্ছে এবং এখানে ব্যবসা।

তাই অধিকার ভিত্তিক ধারা ও ব্যবসা ভিত্তিক ধারার এনজিওদের মাঝে সীমা রেখা টানা প্রয়োজন।

এটি রোধ করার জন্য মার্কিং প্রথা সংশোধন করা, এনজিও বাচাই ও ক্রয় কমিটিসহ এনজিওদের যে কোনো পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য একক এনজিও ও কমিটিতে সভাপতি কর্তৃক মনোনিত এনজিও প্রতিনিধির পরিবর্তে এনজিওদের সমন্বয়কারী সংস্থার প্রতিনিধি অর্ন্তভুক্ত করা হলে এখাতে অনিয়ম অনেক রোধ করা সম্ভব হবে।

তাই, আমরা মনে করি, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সরকারি ও বেসরকারি সকল উদ্যোগের সুষ্ঠু সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।

এজন্য সরকার ও এনজিওর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, একে অপরকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই গড়ে তুলতে পারবে আমাদের স্বপ্নের ক্ষুদা,দারিদ্র মুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ

Flag Counter

December 2019
M T W T F S S
« Nov    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031